Showing posts with label বাংলা সাহিত্য. Show all posts
Showing posts with label বাংলা সাহিত্য. Show all posts

রবীন্দ্রোত্তর কবিসমাজ ; একটি সাধারণ রেখাচিত্র


রবীন্দ্রোত্তর কবিসমাজ : একটি সাধারণ রেখাচিত্র

  আধুনিক বাংলা সাহিত্যে;বিশেষ করে কাব্যে, রবীন্দ্রনাথের ব্যাপক বিস্তৃতির কথা তো আমাদের প্রত্যেকেরই জানা৷ কিন্তু রবীন্দ্রবলয়ের বহির্জগতেও বাংলা আধুনিক কাব্যের একটি সুবৃহৎ পৃথিবী আছে৷ সেই পৃথিবী হয়তোবা রবীন্দ্রযামিনীর মতো ততটা জ্যোৎস্না স্নাত নয়;অপেক্ষাকৃত একটু বেশী ধূসর৷ মর্ত্যপৃথিবীর রূপ,গন্ধ,স্পর্শ,আবেগ,অনুভূতি,মিস্টিক ভাবনা এবং নস্টালজিতে আশ্রয় করে,এই সময়ের কবিরা বাস্তবের ধূপছায়াময় বলয়বেষ্টিত জগতটিকে তুলে ধরলেন তাঁদের কবিতায়৷
    * রবীন্দ্র সমসাময়িক ও পরবর্তী কবিদের স্পষ্ট দুটি ধারা৷ একদল সরাসরি রবীন্দ্রানুসারী; অন্যদল রবীন্দ্র প্রভাব মুক্ত৷ 
 সুধী কবি ও সমালোচক বুদ্ধদেব বসু তাঁর 'রবীন্দ্রনাথ ও উত্তরসাধক' প্রবন্ধে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন৷

 #রবীন্দ্রানুসারী কবিসমাজঃ সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত,কালিদাস রায়,কুমুদরঞ্জন মল্লিক,মানকুমারী বসু,কামিনী রায়,দ্বিজেন্দ্রলাল রায়,করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়,কিরণধন চট্টোপাধ্যায়,যতীন্দ্রমোহন বাগচী,আমিয় চক্রবর্তী প্রমুখ কবিরা৷

 #রবীন্দ্রোত্তর কবিসমাজঃ রবীন্দ্রনাথের প্রায় সমসাময়িক সময়ের কবি হয়েও ভাবগত দিক থেকে সম্পূর্ণভাবেই রবীন্দ্রপ্রভাব মুক্ত তিনজন কবি হলেন যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত,কাজী নজরুল ইসলাম ও মোহিতলাল মজুমদার৷ আধুনিক কবিসমাজ রবীন্দ্রনাথের রোম্যাণ্টিক কাব্যকুঞ্জে আশ্রয় খুঁজে না পেয়ে,এই ত্রয়ীকবিকে তাঁদের পুরোধা পুরুষ হিসাবে বরণ করে নিলেন৷

##কল্লোলের সময়পর্ব থেকে আধুনিক কবিদের ধারাবাহিক রেখাচিত্রটি এইরকমঃ

#৩০এর দশকঃ জীবনানন্দ দাশ,বুদ্ধদেব বসু,সুধীন্দ্রনাথ দত্ত,বিষ্ণু দে,অজিত দত্ত,জসীমুদ্দীন ও সমর সেন৷

#৪০এর দশকঃ দিনেশ দাস,সুভাষ মুখোপাধ্যায়,অরুণ মিত্র,কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়,মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়,সুকান্ত ভট্টাচার্য্য ও বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়৷

#৫০এর দশকঃ রাম বসু,নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী,কৃষ্ণ ধর,গৌরাঙ্গ ভৌমিক,শক্তি চট্টোপাধ্যায়,শঙ্খ ঘোষ,সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়,তরুণ সান্যাল,অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত,অমিতাভ দাশগুপ্ত ও বিনয় মজুমদার৷

#৬০এর দশকঃ ভাস্কর চক্রবর্তী,তুষার রায়,পবিত্র মুখোপাধ্যায়,মলয় রায়চৌধুরী,দেবী রায় ও সমীর রায়চৌধুরী৷

#৭০এর দশকঃ কৃষ্ণা বসু,জয় গোস্বামী,সুবোধ সরকার,ব্রত চক্রবর্তী,মল্লিকা সেনগুপ্ত৷

#৮০এর দশকঃ বিশ্বনাথ সিংহ,সুভাষ চন্দ্র ঘোষ,সোমেশলাল মুখোপাধ্যায় ও অনীক রুদ্র৷

#৯০এর দশকঃ সুদীপ্ত মাজি,নিখিলেশ রায়,অমিতবিক্রম রানা,হৃষিতা গুপ্তবক্সী,প্রসুন ভৌমিক,মনোজ ভোজ,রাজীব মিত্র৷

#মূল্যায়নঃ আধুনিক জীবন জিজ্ঞাসা,দর্শন,দুর্ভিক্ষ,মন্বন্তর,নকশাল আন্দোলন,হাংরি জেনারেশন,নারীবাদী,আধুনিকোত্তর এবং উত্তর আধুনিক চেতনা বাংলা আধুনিক কবিতাকে আধুনিকতার পর্ব থেকে পর্বান্তরে ধাবিত করেছে৷৷

ঋণস্বীকারঃ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ
#আলোচকঃ ধনঞ্জয় চক্রবর্তী
  বাংলা ভাষা ও সাহিত্য 
নিয়ামক, Success বাংলা

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উৎসর্গকৃত গ্রন্থ


তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উৎসর্গকৃত গ্রন্থ
------------------------------------------------------------------

উপন্যাস :-
১. চৈতালি ঘূর্ণি (১৯৩১) = নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে।
২. নীলকন্ঠ (১৯৩৩) = শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়কে।
৩. রাইকমল (১৯৩৫) = স্ত্রী উমাশশী দেবীকে।
৪. প্রেম ও প্রয়োজন (১৯৩৬) = সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়কে।
৫. আগুন (১৯৩৭) = পিতা হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
৬. ধাত্রীদেবতা (১৯৩৯) = মাতা প্রভাবতী দেবী ও পিসিমার শ্রীচরণে।
৭. কালিন্দী (১৯৪০) = সজনীকান্ত দাসকে।
৮. কবি (১৯৪২) = মোহিতলাল মজুমদারকে।
৯. গণদেবতা (১৯৪৩) = সরোজ কুমার রায়চৌধুরীকে।
১০. মন্বন্তর (১৯৪৪) = বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল) কে।
১১. পঞ্চগ্রাম (১৯৪৪) = কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
১২. হারানো সুর (১৯৪৫) = সুবলচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
১৩. সন্দীপন পাঠশালা (১৯৪৬) = প্রেমাঙ্কুর আতর্থীকে।
১৪. ঝড় ও ঝরাপাতা (১৯৪৬) = অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তকে।
১৫. অভিযান (১৯৪৬) = মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
১৬. হাঁসুলী বাঁকের উপকথা (১৯৪৭) = কবিশেখর কালিদাস রায়কে।
১৭. তামস তপস্যা (১৯৪৮) = কিরণ কুমার রায়কে।
১৮. পদচিহ্ন (১৯৫০) = প্রেমেন্দ্র মিত্রকে।
১৯. উত্তরায়ণ (১৯৫২) = প্রবোধ কুমার সান্যালকে।
২০. নাগিনী কন্যার কাহিনী (১৯৫৩) = নারায়ণ চৌধুরী, সন্তোষ কুমার ঘোষ ও অনিল চক্রবর্তীকে।
২১. আরোগ্য নিকেতন (১৯৫৩) = মনোজ বসুকে।
২২. স্বর্গ-মর্ত্য (১৯৫৪) = নীহার রঞ্জন গুপ্তকে।
২৩. চাঁপাডাঙার বৌ (১৯৫৫) = শচীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়কে।
২৪. বিচারক (১৯৫৬) = পরশুরাম (রাজশেখর বসু)কে।
২৫. পঞ্চপুত্তলী (১৯৫৬) = স্ত্রী উমাশশী দেবীকে।
২৬. সপ্তপদী (১৯৫৮) = বিমল সিংহকে।
২৭. বিপাশা (১৯৫৮) = রমাপদ চৌধুরীকে।
২৮. রাধা (১৯৫৮) = প্রেমেন্দ্র মিত্রকে।
২৯. যোগভ্রষ্ট (১৯৬০) = অতুল চন্দ্র গুপ্তকে।
৩০. মহাশ্বেতা (১৯৬০)= গজেন্দ্র কুমার মিত্রকে।
৩১. কান্না (১৯৬৩) = শশীভূষণ দাশগুপ্তকে।
৩২. যতিভঙ্গ (১৯৬৩) = বিশ্বনাথ রায়কে।
৩৩. একতি চড়ুই পাখি ও কালো মেয়ে (১৯৬৩) = সত্যজিৎ রায়কে।
৩৪. মঞ্জরি অপেরা (১৯৬৪) = শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
৩৫. জঙ্গলগড় (১৯৬৪) = হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়কে।
৩৬. ভুবনপুরের হাট (১৯৬৪) = শম্ভুনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
৩৭. বসন্তরাগ (১৯৬৪) = শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
৩৮. গন্নাবেগম (১৯৬৫) = মধুসূদন মজুমদারকে।
৩৯. অরণ্যবহ্নি (১৯৬৬) = নন্দগোপাল সেনগুপ্তকে।
৪০. গুরুদক্ষিণা (১৯৬৬) =শশীভূষণ নিয়োগীকে।
৪১. শুকসারীকথা (১৯৬৭) =  সুধাংশুমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
৪২. মণি বউদি (১৯৬৯) = তুষারকান্তি ঘোষকে।
৪৩. ছায়াপথ (১৯৬৯) = হজরথ সারমাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে।
৪৪. কালরাত্রি (১৯৭০) = নির্মল খানকে।
৪৫. রূপসী বিহঙ্গিনী (১৯৭০) = সুধারানী দেবীকে।
৪৬. ফরিয়াদ (১৯৭১) = সন্তোষ কুমার ঘোষকে।
৪৭. অভিনেত্রী (১৯৭১) = নটসূর্য অহীন্দ্র চৌধুরীকে।


♦তথ্যদাতা -- সূর্য পোড়া ছাই।।

এডমিন, সাকসেস বাংলা গ্রুপ।।

বাংলা সাহিত্যে অলংকার


বাংলা সাহিত্যে অলংকার

সাহিত্য স্রষ্টার যে রচনা কৌশল কাব্যের শব্দধ্বনিকে শ্রুতিমধুর এবং অর্থধ্বনিকে রসাপ্লুত ও হৃদয়গ্রাহী  করে তোলে তাকে বলে অলংকার।

বাণী বহিরঙ্গে শব্দময়ী ,  অন্তরঙ্গে অর্থময়ী। তাই অলংকার দুই প্রকার-- শব্দালংকার ও অর্থালংকার।

শব্দালংকার:- শব্দের বহিরঙ্গ ধ্বনির আশ্রয়ে যে কাব্য সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয়  তাকে বলে শব্দালংকার।

 অর্থালংকার- শব্দের অন্তরঙ্গ  অর্থের আশ্রয়ে  যে কাব্য সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয় তাকে অর্থালংকার বলে।

শব্দালংকার তিন প্রকার। -- অনুপ্রাস, যমক ও  শ্লেষ। 

 অনুপ্রাস-- একই বর্ণগুচ্ছ যুক্তভাবেই হোক আর বিযুক্তভাবেই হোক  একাধিকবার আবৃত্ত হলে অনুপ্রাস অলংকার হয়। যেমন-- ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে।

অনুপ্রাস তিন প্রকারের হয়।-- আদ্যানুপ্রাস, মধ্যানুপ্রাস ও অন্ত্যানুপ্রাস।

আদ্যানুপ্রাস-- শব্দের আদি বর্ণের আবৃত্তিতে  আদ্যানুপ্রাস হয়। যেমন-- কেতকী-কেশরে কেশপাশ করো সুরভি।

মধ্যানুপ্রাস--  শব্দের মধ্যস্থিত বর্ণের আবৃত্তিতে মধ্যানুপ্রাস হয়।। যেমন--বাদ্যঘটা লক্ষ বলি অলক্ষে সব যায়  যে চলি।

অন্ত্যানুপ্রাস-- পদান্তের সাথে পদান্তের বা চরণান্তের সাথে চরণান্তের যে ছন্দমিল তাকেই অন্ত্যানুপ্রাস বলে। যেমন-- 
      এসেছে বরষা, এসেছে নবীনা বরষা,
       গগন ভরিয়া এসেছে ভুবনভরসা।

যমক-- দুই বা ততোধিক ব্যক্রন বর্ণ একই স্বরধ্বনিসহ  ভিন্ন ভিন্ন অর্থে দুই বা ততোধিকবার ব্যবহৃত হলে যমক অলংকার হয়। যেমন-- ভারত ভারত খ্যাত আপনার গুণে।
আদ্য যমক--  গিরিশ -করে  গিরীশ করে কন্যা সম্প্রদান।
মধ্য যমক--কোথা হা হন্ত, চিরবসন্ত! আমি বসন্তে মরি।
অন্ত্য যমক--
      কান্তার আমোদপূর্ণ  কান্ত-সহকারে।
       কান্তার আমোদপূর্ণ  কান্ত-সহকারে।।

অন্ত্য যমক একাধারে যমক ও অনুপ্রাস দুইই। কিন্তু অন্ত্যানুপ্রাস অন্ত্য যমক না হতেও পারে।

শ্লেষ-- কোনো শব্দ একবারমাত্র ব্যবহৃত হয়ে একাধিক অর্থ প্রকাশ করলে শ্লেষ অলংকার হয়। যেমন-- এনেছে তোমার স্বামী বাঁধি নিজগুণে।

📚  অর্থালংকার 📚
অর্থালংকারের মধ্যে  উপমা , উৎপ্রেক্ষা , রূপক , ব্যতিরেক ও সমাসোক্তি প্রধান।

উপমা-- একই বাক্যে দুটি বিজাতীয় বস্তুর মধ্যে তুলনা করে যে চমৎকারিত্ব সৃষ্টি করা হয় তাকে উপমা অলংকার বলে। যেমন-- "ননীর মতো কোমল শয্যা পাতা " ----- এখানে শয্যা উপমেয়, ননী উপমান , কোমল উপমান , মতো সাদৃশ্যবাচক শব্দ। তাই এখানে উপমা অলংকার  হয়েছে।

লুপ্তোপমা----  যেখানে উপমেয় , উপমান , সাধারণধর্ম ও তুলনাবাচক শব্দ ------ এই চারটি অঙ্গের যেকোনো একটি বা একাধিক অঙ্গ যদি অনুল্লিখিত থাকে তবে সেখানে লুপ্তোপমা হয়। যেমন--- "তিলেক না দেখি ও চাঁদবদন মরমে মরিয়া থাকি" ।  এখানে বদন উপমেয়, চাঁদ উপমান , সাধারন ধর্ম ও সাদৃশ্যবাচক শব্দ এখানে লুপ্ত।

পূর্ণোপমা----- যে  উপমায় উপমেয়, উপমান, সাধারণধর্ম এবং সাদৃশ্যবাচক শব্দ এই চারটি অঙ্গই উল্লিখিত থাকে তাকে পূর্ণোপমা বলে।  যেমন--- "জ্যোৎস্না নামে মৃদুপদে ঝাঁপি লয়ে লক্ষ্মীর মতন"  ।  এখানে জ্যোৎস্না উপমেয়, লক্ষ্মী উপমান , নামে  সাধারণ ধর্ম , মতন সাদৃশ্যবাচক শব্দ। উপমার চারটি অঙ্গই এখানে উল্লিখিত থাকায় এটি পূর্ণোপমা অলংকার।

মালোপমা--- উপমেয় যেখানে মাত্র একটি এবং তার উপমা অনেক সেইখানে হয় মালোপমা।  যেমন--   মেহগনির মঞ্চ জুড়ি
              পঞ্চ হাজার  গ্রন্থ;
           সোনার জলে দাগ পড়ে না, 
          খোলে না কেউ পাতা
              আস্বাদিত মধু যেমন 
              যুথী অনাঘ্রাতা।

এখানে গ্রন্থ উপমেয়, উপমান মধু আর যুথী।

বস্তু-প্রতিবস্তুভাবের উপমা--- একই সাধারণ ধর্ম যদি উপমেয় আর উপমানে বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয়, তাহলে সাধারণ ধর্মের এই ভিন্ন ভাষারূপ দুটিকে বলাহয় বস্তু প্রতিবস্তু। এই ভাবের উপমার তুলনা বাচক শব্দ ভাষায় প্রকাশ করতেই হবে। যেমন--
               
                    নিশাকালে যথা
                 মুদ্রিত কমলদলে থাকে গুপ্তভাবে
               সৌরভ, এ প্রেম, বঁধু, আছিল হৃদয়ে
                   অন্তরিত।
এখানে উপমেয় প্রেম, উপমান সৌরভ, সাধারণধর্ম  অন্তরিত গুপ্তভাবে বস্তুপ্রতিবস্তু। অন্তরিত, গুপ্তভাবে ভাষায় বিভিন্ন কিন্তু অর্থে এক--- গোপনে। তুলনাবাচক শব্দ ,যথা।

বিম্ব প্রতিবিম্বভাবের উপমা-- উপমেয়ের ধর্ম এবং উপমানের ধর্ম যদি সম্পূর্ণ বিভিন্ন হয় অথচ তাদের মধ্যে যদি একটা সূক্ষ্ম সাদৃশ্য বোঝা যায়, তাহলে ওই ধর্মদুটিকে বলা হয় বিম্বপ্রতিবিম্বভাবাপন্ন সাধারণ ধর্ম। বিম্বপ্রতিবিম্বভাবের উপমায় তুলনাবাচক শব্দ থাকতেই হবে। যেমন-- 

কানুর পিরীতি                   বলিতে বলিতে
              পাঁজর ফাটিয়া উঠে।
শঙ্খবণিকের                   করাত যেমতি
           আসিতে যাইতে কাটে।।

এই উদাহরণটিতে উপমেয়  কানুর পিরীতি , উপমান  শঙ্খবণিকের করাত, উপমেয়র ধর্ম বলিতে বলিতে পাঁজর ফাটিয়া উঠে  এবং  উপমানের ধর্ম  আসিতে যাইতে কাটে।   সব অবস্থাতেই দুঃখময়  এই তাৎপর্যে ধর্মদুটির সাদৃশ্য পাওয়া যাচ্ছে বলে এরা প্রতিবিম্ব ভাবের সাধারণ ধর্ম।

স্মরণোপমা---- কোনো পদার্থের অনুভব থেকে যদি তৎ সদৃশ অপর বস্তুর স্মৃতি মনে জেগে ওঠে তবেই স্মরণোপমা অলংকার হয়।  যেমন--- 

     শুধু যখন আশ্বিনেতে
       ভোরে শিউলিবনে
          শিশিরভেজা হাওয়া বেয়ে
              ফুলের গন্ধ আসে
                  তখন কেন মায়ের কথা
                      আমার মনে ভাসে?

আলোচক- গার্গী চ্যাটার্জি
অ্যাডমিন, Success বাংলা।

বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্য




বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্য
................................................... 
     মানব সভ্যতার ইতিহাসে গোয়েন্দা গল্পের ধারা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির মতো স্বাভাবিক ভাবেই বহমান ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গোয়েন্দা গল্পের প্রকৃতি পাল্টাচ্ছে। আমাদের দেশজ সাহিত্যে গোয়েন্দা গল্পের সৃষ্টিকর্তা কে তা বলা কঠিন,আশ্চর্যের বিষয় প্রাচীন বৈদিক যুগ ঋগবেদের দশম মন্ডলের সূত্রতে প্রথম গোয়েন্দার সন্ধান পাওয়া যায়। আমার আলোচনার বিষয় বাংলা সাহিত্যে গোয়েন্দা গল্প সৃষ্টিকারী লেখক ও গোয়েন্দা চরিত্র। কালানুক্রমিক ভাবে এই বিষয়টি উপস্থাপন করা হল–
1) ১৮৯২ সাল থেকে সরকারী ডিটেকটিভ বিভাগে কর্মরত প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের গল্পে সিরিজ প্রথম বের হতে থাকে  'দারোগার দপ্তর' নামে।প্রথম  বই 'বনমালী দাসের হত্যা '।
2)ভুবন চন্দ্র মুখোপাধ্যায় কেলেঙ্কারি ও অপরাধ মূলক ঘটনা নিয়ে লেখেন 'হরিদাসের গুপ্তকথা'যা ১৮৯৬ এ ছয় খন্ডে 'মার্কিন পুলিশ কমিশনার নামে'প্রকাশিত হয়।
3) কালীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায় ১৮৯৬ এ 'বাঁকাউল্লার দপ্তর' প্রকাশ করেন।
5) গিরিশ চন্দ্র বসু লেখেন 'সেকালের দারগা কাহিনি' (১৮৯৩-৯৪) নবজীবন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
6) 'ভারতী' পত্রিকায় প্রকাশিত গোয়েন্দা গল্প গুলি হল-নগেন্দ্রনাথ গুপ্তের ('চুরি না বাহাদুরি', ১২৯৮),হরিসাধন মুখোপাধ্যায়ের ('হত্যাকারী কে', ১২৯৭) প্রমুখ। হরিসাধনের 'আশ্চর্য হত্যাকান্ড'(সখা ও সাথী)তে প্রকাশিত গল্পটি গবেষকদের মতে প্রথম বাংলা কিশোর থ্রিলার।
7) দীনেন্দ্র কুমার রায় এর প্রথম মৌলিক রচনা 'উদোর ঘিরে বুদোর বোঝা' (১২৯৯)।'নন্দন কানন' পত্রিকায় অন্য নামে তিনি লিখতেন। তাঁর বিখ্যাত গল্প গুলি 'আয়েষা,' 'শী,' 'চীনের ড্রাগন' প্রভৃতি ।তিনি 'রহস্য লহরী 'নামে গোয়েন্দা গল্পের সিরিজ প্রকাশ করে থাকেন।
8) বাংলা গোয়েন্দা গল্পের বাঁক বদল করলেন পাঁচকড়ি দে। ইনিই প্রথম বাংলা গল্পের দুটি ডিটেকটিভ চরিত্র সৃষ্টি করলেন -দেবেন্দ্রবিজয় ও তার সহকারী অরিন্দম। তাঁর 'নীলবাসনা', 'মায়াবিনী', 'রহস্য বিপ্লব 'ইত্যাদি।
9) ত্রিশের দশকে রোমাঞ্চ পত্রিকার হাত ধরে প্রণব রায় আনলেন গোয়েন্দা প্রতুল লাহিড়ীকে।
10)সুরেন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য বেশ কয়েকটি গোয়েন্দা গল্প লিখেছেন। সেই গুলি হলো-'দুই দারোগা', 'নকল রানী,'ধরিবাজ চোর ইত্যাদি।
11)বাংলা সাহিত্যে সরলাবালা দাসী গোয়েন্দা কাহিনির প্রথম মহিলা লেখিকা। তাছাড়া বাংলা সাহিত্যে মহিলা গোয়েন্দা চরিত্র প্রথম কল্পনা করেচ্ছেন প্রভাবতী দেবী সরস্বতী।তাঁর প্রথম উপন্যাস 'গুপ্তঘাতক' (১৯৫২)।
12)বাংলা গোয়েন্দা কাহিনিতে নতুনত্ব নিয়ে আসেন হেমেন্দ্র কুমার রায়। তিনিই প্রথম ডিটেকটিভ ভাবনায় বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সঞ্চার করেছিলেন। তাঁর 'জয়ন্তের কীর্তি,' 'শনি মঙ্গলের রহস্য', 'সাজাহানের ময়ূর 'ইত্যাদি বহু পরিচিত।
13) বাংলা গল্পের শক্তিশালী লেখকদের মধ্যে প্রথমেই মনে পড়ে নীহারঞ্জন গুপ্তের নাম। সাহেব গোয়েন্দা কিরীটি রায় তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি। তাঁর শ্রেষ্ঠ অপরাধী চরিত্র কালোভ্রমরকে ভোলা যায় না।
14)সুকুমার সেন বাংলা গোয়েন্দা কাহিনির শ্রেষ্ঠ লেখকের মর্যাদা দিয়েছেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তাঁর সৃষ্ট চরিত্র সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী আমাদের সকলের কাছে প্রিয় চরিএ হয়ে উঠেছে। তাঁর কয়েকটি উপন্যাস হল – 'চিরিয়াখানা', 'মাকড়সার রস', 'চোরাবালি' ইত্যাদি।১৩৩৯ এ 'বসুমতী'পত্রিকার 'পথের কাঁটা' দিয়ে ব্যোমকেশ এ যাত্রা শুরু।
15)উপেন্দ্রকিশোর রায়ের নাতনী নলিনী দাস ষাটের দশকে বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যে আনলেন মেয়ে গোয়েন্দার দল 'গন্ডালু'। সন্দেশ পত্রিকায় এই 'গান্ডালু' র আবির্ভাব। ২৯ টি নলিনী তাদের হাজির করেছেন।
16)সত্যজিৎ রায় ১৯৬৫ তে ফেলুদার গোয়েন্দা গিরি দিয়ে গল্প লেখা শুরু করেন। তাঁর সৃষ্ট ফেলুদা অর্থাৎ প্রদোষ চন্দ্র মিত্র,তোপসে,লাল মোহন গাঙ্গুলী চরিত্র গুলি অনবদ্য।
17)মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য ১৯২৮ সালে রামধনু পত্রিকায় তাঁর জাপানি গোয়েন্দা হুকোকাশির আবির্ভাব ঘটালেন পদ্মরাগ উপন্যাসে।তাঁর সম্পাদিত 'রহস্যচক্র' নামে গোয়েন্দা সিরিজ প্রকাশ হতো। এখানে প্রথম গজেন্দ্র কুমার মিত্র লেখেন 'রেশমী ফাঁস' ।
18)পঞ্চাশের দশকে দেব সাহিত্য কুঠীরের হাত ধরেই স্বপন কুমার আনলেন 'বিশ্বচক্র সিরিজ'।

19)দেব সাহিত্য কুঠীর থেকে সৌরীন্দ্র মোহন মুখোপাধ্যায় ছদ্মনামে সব্যসাচী র আড়ালে লেখেন 'প্রহেলিকা' সিরিজ।
20)১৯৩৮ এ জেনারেল অ্যান্ড পাবলিশার্স লিমিটেড থেকে মিহির কুমার সিংহের সম্পাদনায় প্রকাশ করেন 'বিচিত্র রহস্য' সিরিজ।
21)১৯৪২ সাল থেকে শশধর দত্তের মোহন সিরিজ প্রকাশিত হতো।
22)১৯৫৬ তে রোমাঞ্চ পত্রিকায় প্রেমেন্দ্র মিএ গোয়েন্দা পরাশর বর্মাকে পাঠকের কাছে হাজির করলেন। প্রথম লেখা 'গোয়েন্দা কবি পরাশর'।
23)গোয়েন্দ্র গল্পে যুক্তি বুদ্ধির দাপট দেখিয়েছেন সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ। তাঁর গোয়েন্দা গল্পে সৃষ্ট চরিএ কনেলকে।
24)নারায়ন সান্যাল এর 'কাঁটা সিরিজ' বেশ উল্লেখযোগ্য। তাঁর সৃষ্ট গোয়েন্দা চরিএ গুলি হল পি.কে. বসু,শার্লক হেবো।
25)শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গোয়েন্দা চরিত্র বরদাচরণ। এই চরিএটি কিশোর পাঠ্য সাহিত্যে মজার চরিত্র। তাঁর সৃষ্ট আর একটি চরিত্র শবর দাশগুপ্ত পাঠকের কাছে খুবই জনপ্রিয়।
26)সমরেশ বসুও লিখেছেন ছোটদের জন্য গোয়েন্দা কাহিনি। তাঁর গোয়েন্দা গল্পের নায়ক গোগোল ঠিক গোয়েন্দা না হয়েও প্রবল অনুসন্ধিৎসু ও কৌতূহল প্রবণ। এর দ্বারা সে দোষীদের ধরিয়ে দিত।
27)সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একটু অন্য ধরনের অ্যাডভেঞ্চার চরিএ বানালেন রাজা রায়চৌধুরী অর্থাৎ কাকাবাবুকে।
28)'রহস্য রোমাঞ্চ' পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন বিমল কর ও কবি অরুণ ভট্টাচার্য। বিমল করের সৃষ্ট চরিএ ম্যাজিশিয়ান কিকিরা ও দুই সহযোগী ।তাদের লক্ষ্য সত্য উদ্ঘাটন।
29)রহস্য পত্রিকার সম্পাদক গোবিন্দলাল বন্দোপাধ্যায় বিভিন্ন নামে লিখতেন। তাঁর প্রধান গোয়েন্দা দিলীপ সান্যাল ও তার সহকারী ত্রিদিব চৌধুরী।
30)কবি আনন্দ বাগচীর গোয়েন্দা সত্যপ্রিয়। তাছাড়া তারাপদ রায়, রবীন দেব, শ্রীধর চৌধুরী এবং অমিত চট্টোপাধ্যায় এদের হাতে বাংলা সাহিত্যের নানা গোয়েন্দা চরিএ সৃষ্টি হল।
31)হীরেন চট্টোপাধ্যায় গোয়েন্দা সাহিত্যে আনলেন দুজন গোয়েন্দাকে ।তারা হলেন সুধাময় ও ম্যাক চৌধুরী।
32)হাসির গল্পকার হিমানীশ গোস্বামী হাস্যরস সহযোগে গোয়েন্দা গল্প লিখেছেন।
33)অবাঙালি লেখক গুরুনেক সিং বাংলায় গোয়েন্দা গল্প লিখেছেন।
34)হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায় সৃষ্টি করলেন গোয়েন্দা পারিজাত বক্সীকে।এই পারিজাত বক্সী কল্পিত হয়েছে ব্যোমকেশ বক্সীর ভাইপো হিসাবে।
35)এছাড়া পূর্ণেন্দু পত্রী নিয়ে ছিলেন তার গল্পের গোয়েন্দা চরিএ হিসাবে ব্যোমকেশ এর পুত্র জুনিয়ার ব্যোমকেশকে।
36)বাংলা সাহিত্যের কয়েকজন মহিলাকে উজ্জ্বল হতে দেখি। যেমন -প্রদীপ্ত রায়ের গোয়েন্দা জগদ্দলের জগাপিসি,মনোজ সেনের দময়ন্তী ।
37)সুচিত্রা ভট্টাচার্যের মিতিন মাসী বাংলা সাহিত্যের নামকরা গোয়েন্দা হয়ে উঠেছিল।
38)শেখর বসু অল্পবয়সী গোয়েন্দা চিন্ময়কে সৃষ্টি করলেন।
39)'কিশোর ভারতী' পত্রিয়ায় দিলীপ কুমার চট্টোপাধ্যায় সৃষ্টি করলেন 'ব্ল্যাক ডায়মন্ড' সিরিজ।
40)বিখ্যাত লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের 'এসো নীপবনে' উপন্যাসে এক গোয়েন্দাকে আমরা পাই।
41)কিশোরদের জন্য ডিটেকটিভ গল্পের সিরিজ এনেছেন ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়। এছাড়া গোয়েন্দা গল্প সৃষ্টিকারী অন্যান্য লেখকরা হলেন –ধীরেন্দ্রলাল ধর, সুকুমার সেন, প্রতুল চন্দ্র গুপ্ত প্রমুখ।
♢♢♢বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের ইতিহাস সুদীর্ঘ। সুপ্রাচীন কাল থেকে এখনত্ত পর্যন্ত এই গোয়েন্দা গল্প আমাদের সকলের কাছে পছন্দের বিষয়। এই গোয়েন্দা গল্প নিয়ে নানান ধরনের চলচ্চিত্র তৈরি করা হচ্ছে। এই গোয়েন্দা গল্প আমার খুব প্রিয়। তাই আলোচনা করলাম।


আলোচনায় - সুপর্ণা রক্ষিত।
Success বাংলা

নাথ সাহিত্য


নাথ সাহিত্য
============================
     মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য প্রধানত বিভিন্ন ধর্ম ও উপধর্ম সম্প্রদায়ের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। শাক্ত , শৈব , বৌদ্ধ , বৈষ্ণব-- এগুলি প্রধান ধর্ম সম্প্রদায়। এই মিশ্র ধর্মচেতনা সারা ভারতবর্ষকেই নিয়ন্ত্রিত করেছে। শৈব নাথ ধর্মমতও বিচিত্র ধর্মবোধের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বাংলাদেশে শৈব নাথ সম্প্রদায় এখনও আছে। যুগী নামেই তারা পরিচিত।দশম শতাব্দীর দিকে সারা উওর ভারতে গোরক্ষপন্থী নাথ সম্প্রদায় ছিলো। পশ্চিম ভারতেও এঁদের প্রভাব দেখা যায়। বাংলাদেশেও এই সম্প্রদায় অতি প্রাচীনকাল থেকে নিজেদের সাধনভজন করে আসছিলেন এবং এখনও নানা শাখায় এঁরা বাংলাদেশের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে আছেন। এঁদের ধর্মকর্ম ও আচার আচরণকে কেন্দ্র করে অনেক ছড়াপাঁচালী, লোকগীতি, আখ্যানকাব্য পাওয়াগেছে। সাহিত্যের ইতিহাসের দিক থেকে এর মূল্য অপরিসীম। দীনেশচন্দ্র সেন মনে করেন এই সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত ময়নামতীর গান , গোপীচন্দ্রের গান , গোরক্ষবিজয় প্রভৃতি ছড়াগান ও আখ্যানকাব্য বাংলা সাহিত্যের আদিপর্ব অর্থাৎ দশম-দ্বাদশ শতাব্দীর দিকে রচিত হয়েছিলো।
     একসময় ভারতের কোন কোন দার্শনিকগোষ্ঠী জড়দেহকে মুক্তির বাধা না বলে সোপান হিসেবেই গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁরা নানা ধরনের যৌগিক , তান্ত্রিক, রাসায়নিক , আয়ুর্বেদ সংক্রান্ত ভিষগবিদ্যার সাহায্যে জড়দেহকে পরিশুদ্ধ করঃ তার সাহায্যে মোক্ষ মুক্তিলাভের আকাঙ্ক্ষা করতেন। এঁরা দর্শন হিসাবে পতঞ্জলির যোগদর্শন ও ক্রিয়াকর্ম হিসাবে তন্ত্র ও হঠযোগের সাহায্য নিয়ে পিন্ডদেহকে দিব্যদেহে পরিণত করতে প্রয়াসী হন। এককথায় এঁদের যোগীসম্প্রদায় বলে। কারণ এঁদের সাধনার দার্শনিক ভিত্তি পতঞ্জলির যোগ দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এঁরা কায়াসাধনা করতেন অর্থাৎ পিন্ডদেহ বা ভূতকায়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতেন। অনেকে মনেকরতেন এই সাধনার দ্বারা ভঙ্গুর জীবনকে "অজরামরবৎ প্রাজ্ঞ" করা যায়।
     যোগের দ্বারা প্রাণায়ামাদির দ্বারা এঁরা নিশ্বাস প্রশ্বাসকে ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রিত করতে পারতেন। পূরক-কুম্ভক-রেচক শীর্ষক বায়ু বশীভূত করে এঁরা মোক্ষলাভের প্রথম সোপান অতিক্রম করতেন। তারপর তন্ত্রের কুলকুন্ডলিনী তত্ত্ব অবলম্বনে নিজ দেহমধ্যে শিরঃস্থিত সহস্রদলযুক্ত পদ্মসহস্রারে, শিবশক্তির মিলনসম্ভূত দিব্যানুভূতি লাভকরতেন। তখন অবশ্য পাঞ্চভৌতিক জড়দেহ অপার্থিব দিব্যদেহে পরিণত হত। এঁরা মূলত আত্মবাদী, ঈশ্বরবাদী ততটা নন। সাধন প্রক্রিয়ার দ্বারা নিজের মোক্ষলাভ হল এঁদের সাধনা। শিব এঁদের আদি গুরু। তিনিই আদিনাথ। তাঁর শিষ্য মীননাথ। মীননাথের শিষ্য গোরক্ষনাথ। এই গোরক্ষনাথের পবিত্র জীবনকাহিনি নিয়ে সারা ভারতেই কত গান গল্প রচিত হয়েছে। ইনি নিজের গুরু মীননাথকে বুদ্ধিভ্রষ্টতা থেকে উদ্ধার করে স্মরণীয় হয়েছেন। শিব আদিনাথ হলেও চরিত্রগৌরবে গোরক্ষনাথ অসাধারণ খ্যাতি অর্জন করেছেন। মানুষ হয়ে মাহাত্ম্যে দেবতাকেও ছাড়িয়ে গেছেন। তাই নাথপন্থীরা কোন কোন প্রদেশে গোরক্ষপন্থী নামেও পরিচিত।
     নাথধর্মে ন-জন গুরুর কথা জানা যায়। বৌদ্ধ তান্ত্রিকরাও তাঁদের ৮৪ জন সিদ্ধাচার্যের সাথে এই নয়-জন নাথের পূজা করতেন। তাঁদের নাম --- পূর্বে গোরক্ষনাথ। উওরপথে জলন্ধর। দক্ষিণে নাগার্জুন। পশ্চিমে দত্তাত্রেয়। দক্ষিণ-পশ্চিমে দেবদত্ত। উওর-পশ্চিমে জড়ভরত। কুরুক্ষেত্র ও মধ্যদেশে আদিনাথ এবং দক্ষিণ- পূর্বে সমুদ্রোপকুলে মৎসেন্দ্রনাথ।

আলোচক - গার্গী চ্যাটার্জী

কল্লোল ও বাংলাসাহিত্য।

আধুনিক বাংলা কবিতা কোনগুলি? এ প্রশ্নের উত্তরে সাহিত্যের ছাত্রছাত্রীদের সাধারণ অর্থে রবীন্দ্র পরবর্তীযুগের কবিতার কথাই মনে আসে। সেই সূত্র ধরে আসে ‘কল্লোল’এর কথাও। কল্লোল  [বিশেষ্য পদ] এর অর্থ মহাতরঙ্গ বা  কলরব । কল্লোলযুগের শুরুর কাহিনীর জন্য আমাদের ফিরে তাকাতে হয় ভারতীয় ইতিহাসের বিশের দশকের দিকে। উত্তাল সময়। একদিকে ইংরেজ শাসনের অত্যাচার,  প্রথম মহাযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ, পশ্চিমে রাশিয়ার সাম্যবাদী বিপ্লব,  বিশ্বজুড়ে মার্ক্সিস্ট চিন্তাধারার বিস্তার, অন্যদিকে নিজ দেশের শিল্পসাহিত্য জগতের থমকে থাকা ভাব। ঠিক এই সময়টিতে চারজন তরুণ মানুষ গোকুলচন্দ্র নাগ, দীনেশরঞ্জন দাস, সুনিতা সেন ও মানবেন্দ্রনাথ বাসু মিলে একটা ঘরোয়া আড্ডার আয়োজন করেন, “ফোর আর্টস ক্লাব” নাম দিয়ে। উদ্দেশ্য ছিল সাহিত্য, শিল্পকলা, সঙ্গীত ও নাটক সম্পর্কিত আলোচনা এবং নিয়মিত চর্চা। একই সাথে তাঁরা ‘ঝড়ের দোলা’ নাম দিয়ে একটা ছোট গল্পের সংকলন বের করেন, ১৯২২ সালে। ঝড়ের দোলার প্রেরণা নিয়েই দীনেশরঞ্জন দাস ও গোকুলচন্দ্র নাগ, দুবন্ধুতে মিলে একটি সাহিত্যগোষ্ঠী এবং তার সাথে একটা সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করেন যার নামকরণ করা হয় “কল্লোল”। সালটা ১৯২৩। মাত্র সাতবছর (১৯২৩-১৯৩০) চলা এই পত্রিকাটির প্রভাব আজও অস্বীকার করা যায় না।

* নতুন কিছু করার প্রয়াস নিয়ে শুরু হওয়া ‘কল্লোল’ অভিনবত্ব আনে বিষয়ে, রচনাভঙ্গিমায় এবং লেখকগোষ্ঠীতে। সচেতনভাবে রবীন্দ্রনাথের লেখার স্টাইলের বিরোধিতা পত্রিকাটির অন্যতম লক্ষ্য ছিল বলেই মনে হয়, কিন্তু পরবর্তীকালের ভাবহীন সৌন্দর্যহীন ব্যক্তিগত আক্রমণ প্রাথমিক পর্যায়ের সুরের সাথে মেলে না। শুরুর রূপকার অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের মন্তব্য বিশেষ উল্লেখ্য - ‘‘ভাবতুম, রবীন্দ্রনাথই বাংলা সাহিত্যের শেষ, তাঁর পরে আর পথ নেই, সংকেত নেই। তিনিই সবকিছুর চরম পরিপূর্ণতা। কিন্তু “কল্লোলে” এসে আস্তে আস্তে সে-ভাব কেটে যেতে লাগল। বিদ্রোহের বহ্নিতে সবাই দেখতে পেলুম যেন নতুন পথ, নতুন পৃথিবী। আরো মানুষ আছে, আরো ভাষা আছে, আছে আরো ইতিহাস। সৃষ্টিতে সমাপ্তির রেখা টানেননি রবীন্দ্রনাথ- তখনকার সাহিত্য শুধু তাঁরই বহুকৃত লেখনির হীন অনুকৃতি হলে চলবে না। পত্তন করতে হবে জীবনের আরেক পরিচ্ছেদ’’।

* কল্লোল-ই সমকালের ইংরাজি এবং বিদেশি লেখকদের অনুসরণে বাংলাসাহিত্যের পাঠকের পরিচয় করায় এমিল জোলার ন্যাচারালিজম, বোদলেয়ারের শারীরিক ভাবনা, ইংল্যন্ডের ‘ব্লুমসবেরি’ সাহিত্যিক গোষ্ঠীর তির্যক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে। অন্যদিকে মার্ক্স, ফ্রয়েডও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে এই সাহিত্যগোষ্ঠীকে ফলত তৈরি হয় এক নতুন রচনাশৈলীর।

বাংলা সাহিত্যে কল্লোলের অবদান সূত্রাকারে এভাবে সাজানো যেতে পারে-

* অপরিণত রোমান্টিক তরল আবেগের বদলে সাহিত্যে আসে প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামের চিত্র।
* মধ্য ও নিম্নবিত্ত মানুষের আর্থিক দুর্গতির প্রতি সহানুভূতি।
* নরনারীর সম্পর্ক বিচারে সংস্কারমুক্ত প্রকাশভঙ্গী।
* সাহিত্যে পোয়েটিক জাস্টিসের বিরোধীতা। অর্থাৎ প্রচলিত মূল্যবোধ ধর্ম-প্রেম-সত্য-সৌন্দর্য্যের প্রতি আস্থাহীনতা।

পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত ‘মহানগর’, ‘সংসার সীমান্তে’, ‘পুন্নাম’, ‘স্টোভ’(প্রেমেন্দ্র মিত্র), ‘রসকলি’(তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম গল্প), ‘কয়লাকুঠির দেশ’ (শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়) সবকটির পাঠেই উপরের বৈশিষ্ট্যগুলি স্পষ্ট।অন্যদিকে ‘কল্লোল’-এর সমালোচনাও হয়েছিল বিস্তর। ‘নীলকন্ঠ’ ছদ্মনামে দীপ্তেন্দ্রকুমার সান্ন্যাল তীব্র ভাষায় বলেন- “কল্লোল কোনও কালে যুগ নয়; কোনও এককালে হুজুগ ছিল,- এখন তাও নয়”। পরবর্তীকালে আধুনিকতার নামে নিম্নরুচির সাহিত্য চর্চা কল্লোলের মুখ্য উদ্দেশ্য ব্যহত করে। তবে ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণের যুগে বাংলা সাহিত্যে নতুন যুগের সূচনা হয়। এই সময় থেকে ধর্মীয় বিষয়বস্তুর বদলে মানব-মনস্তত্ত্ব বাংলা সাহিত্যের প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। এরপর রবীন্দ্র-প্রভাবের মধ্যেই কল্লোল পত্রের মাধ্যমে একদল তরুণ কবি-সাহিত্যিকের হাতে পাশ্চাত্য আধুনিকতার পত্তন হয়। যা আখেরে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধই করেছিল।

আলোচক: - জুঁই ব্যানার্জী ( সদস্য সাকসেস বাংলা)