Showing posts with label নাট্যকার. Show all posts
Showing posts with label নাট্যকার. Show all posts

উৎপল দত্ত

                         ¤ উৎপল দত্ত ¤
         _______________________________

" আমি শিল্পী নই । নাট্যকার বা অন্য যে কোন আখ্যাও লোকে আমাকে দিতে পারে । তবে আমি মনে করি , আমি ' প্রোপ্যাগনিস্ট'।- এটাই আমার মূল পরিচয়।" - এমন স্পষ্ট কথাতে যিনি আজীবন অবিচল থেকেছিলেন তিনি উৎপল দত্ত । ব্রেখটীয় রীতিকে সাদরে গ্রহণ করে তিনি মার্কসবাদী দর্শনের প্রতি শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠা প্রকাশ করেন থিয়েটারে । জনগণের থিয়েটার গঠন ছিল তাঁর আজীবন সাধনা । তার সেই সাধনার পথেই মিলেছে গগনচুম্বী খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা।
১৯২৯ , ২৯ মার্চ অধুনা বাংলাদেশের বরিশালে উৎপল দত্ত জন্মগ্রহণ করেন কিন্তু আভিজাত্যবোধের তাড়নাতে শৈশবের শিলং শহরকেই জন্মস্থান বলে নির্দেশ করতেন। আদিনিবাস কুমিল্লা। পিতা গিরিজারঞ্জন দত্ত, মাতা শৈলবালা দত্ত । পিতা গিরিজারঞ্জন দত্ত প্রথম জীবনে বঙ্গবাসী কলেজের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক , পরে ব্রিটিশ সরকারের উচ্চপদস্থ চাকরী গ্রহন করেন , যা ছিল বদলির । উৎপলরা পাঁচ ভাই , তিন বোন ; তিনি ছিলেন ষষ্ঠ সন্তান । ডাকনাম শঙ্কর,  পিতা প্রদত্ত নাম ছিল উৎপলরঞ্জন দত্ত, তবে তিনি তা পরিবর্তন করে উৎপল নামটি গ্রহণ করেন ।
১৯৩৫ এ বালক উৎপলের বিদ্যালয় জীবনের সূচনা সেন্ট এডমন্ড স্কুলে  ( শিলং) ।
১৯৩৯ - ৪২এ দশ বছর বয়সে তিনি কলকাতার সেন্ট লরেন্স স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন ।
১৯৪৩ এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে স্কুল বন্ধ হয়ে গেলে তিনি নবম শ্রেণীতে ভর্তি হন সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে । এই স্কুলের উদ্যোগে সাঁ সুঁসি প্লেয়ার্স প্রযোজিত নাটক " হ্যামলেট "  এডিট দ্বিতীয় কবর খনকের ভূমিকায় অভিনয় করেন ।
১৯৪৪ এ ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেন ।
১৯৪৫ - ৪৬  এ সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পঠন রত অবস্থাতে ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসের প্রথম বর্ষে কলেজের পত্রিকাতে নিবন্ধ লেখেন - " A Glance at Modern Russian Literature" ও " বাস্তবতা ও বাংলা সাহিত্য"।
১৯৪৭ এ কলেজ ম্যাগাজিনে "Three Bengali Novelist "  এবং "Symphony"  লেখেন । প্রতাপ রায় ও সতীর্থ ইহুদী বন্ধু নিয়ে গড়ে তোলেন " দ্য অ্যামেচার শেক্সপিয়ারিয়ানস্ " প্রথম নাটক " রিচার্ড দ্য থার্ড "। প্রথম অভিনয় ১৫ আগস্ট । পরিচালক হিসেবে প্রথম স্বীকৃতি লাভ করেন । এই অভিনয় দেখে ভারত ভ্রমণে আগত দ্য শেক্সপিয়ারানা ইন্টারন্যাশানাল কোম্পানি জেফ্রি কেন্ডাল আমন্ত্রণ জানান তাঁর পেশাদার টিমে অভিনেতা রূপে যোগ দেন । এ বছরেই " মার্চেন্ট অব ভেনিস " এ অ্যান্টেনিও চরিত্রে অভিনয় করে পেশাদার অভিনয় জীবন শুরু ।
১৯৪৮  তে পেশাদার অভিনয়ে কেন্ডাল সাহেবকে গুরু হিসেবে বরণ করেন, এই পর্বে অভিনয় -
জুলিয়াস সিজার - ডিসিয়াস চরিত্র
মার্চেন্ট অব ভেনিস - অ্যান্টোনিও
সি স্টুপস টু কঙ্কার - স্যার চার্লস
ওথেলো - রডেরিগো
গ্যাসলাইট - কনস্টেবল
এছাড়াও বহু নাটক ।
এই বছরে জুন মাসে দ্য অ্যামেচার শেক্সপিয়ারিয়ানস্ এর রোমিও জুলিয়েট প্রযোজনার স্মারক গ্রন্থে  রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুরুত্ব বিষয়ে প্রোডাকশন ম্যানিফেস্টো প্রবন্ধ প্রকাশ করে দলের মধ্যে বিতর্ক হলঃ দলের নাম পরিবর্তন করে লিটল থিয়েটার গ্রুপ রাখা হয়। সম্পাদক এলান ডেভিড । এই ইংরেজি পর্বের অভিনীত তাঁর চরিত্র হল -
ওথেলো - নামভূমিকা
মিড সামার নাইটস ড্রিম - বটম
রোমিও জুলিয়েট - মারকুশিও ইত্যাদি ।
১৯৪৯ এ কলেজ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হল প্রথম একাঙ্ক নাটক বেটি বেলসাজার । এই বছরেই স্নাতক হন তিনি । সাংবাদিক বৃত্তিগ্রহন " দ্য স্টেটসম্যান" পত্রিকাতে কোর্ট রিপোর্টার রূপে , কিছুকাল পর তা ত্যাগ করে চিত্র পরিচালক মধু বসুর আহ্বানে যান । পাশাপাশি তিনি এন্ড্রোক্লিস এন্ড লায়ন , ডিস্টিংসগুইশড গ্যাদারিং ,  ম্যাকবেথ অভিনয়ের সাথে বৈপ্লবিক পথে এগিয়ে যান।
১৯৫০ এ  কলেজের মঞ্চে জুলিয়াস সিজার এর আধুনিকিকরণে উচ্ছ্বসিত প্রশংসায়  স্টেটসম্যান লিন্ডসে এমার্সন তাঁর পক্ষপাতের পালাবদল ঘটান দ্য ক্যালকাটা ড্রামাটিক ক্লাবের পাল্লা থেকে এল টি জি র দিকে ; শিউলি মজুমদারের অনুবাদে ইবসেনের গোস্টস  প্রথম অভিনীত হল ।

১৯৫২ তে মাত্র দশমাস গণনাট্য সংঘে থাকার পর থাকার পর উপলব্ধি ' গণনাট্যে আর থাকতে পারলাম না ' । এল টি জি - এ তখন তিনি মঞ্চাধ্যক্ষ হিসাবে যোগদান করেন । এছাড়াও যোগ দেন তরুণ রবি ঘোষ ও সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় । তিনি বলেন " গণনাট্য সংঘ যে আদর্শ আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছিল সে আদর্শকে আঁকড়ে ধরার বাসনা আমাদের প্রায় সবাইকে পেয়ে বসেছিল । মিটিং করে স্থির করা হলো লিটল থিয়েটার গ্রুপ সম্পূর্ণত বাংলা নাটকে মনোনিবেশ করবে ।"
১৯৬১ এ ২৯ শে মার্চ শোভা সেনের সঙ্গে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন ।
কন্যা বিষ্ণুপ্রিয়া জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬২ খ্রী ।

☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆
এল টি জি সংঘের প্রযোজন, উৎপল দত্ত অভিনীত ও নির্দেশিত নাটক --

অভিনীত নাটক , সময়কাল এবং চরিত্র
ম্যাকবেথ           ১৯৫৪         ম্যাকবেথ ▪
নীচের মহল        ১৯৫৭         গগন▪
ছায়ানট             ১৯৫৮         বিনয়েন্দ্র▪
ওথেলো            ১৯৫৯           ওথেলো▪
বুড়ো সালিকের  ১৯৫৯         ভক্তপ্রসাদ▪
ঘাড়ে রোঁ
অঙ্গার               ১৯৫৯            গফুর▪
ফেরারি ফৌজ    ১৯৬১           নীলমণি ▪
ভি আই পি         ১৯৬২             পথচারী ▪
তিতাস একটি নদীর
নাম                     ১৯৬৩            কালোবরণ▪
রোমিও জুলিয়েট ১৯৬৪            মারকুশিও ▪
মিড সামার নাইটস ১৯৬৪            বটম▪
ড্রিম
ওথেলো                    ১৯৬৪         ওথেলো ▪
জুলিয়াস                ১৯৬৪           ব্রুটাস  ▪
সিজার
কল্লোল                 ১৯৬৫             র্র্যাটট্রে▪
প্রফেসর ম্যামলক ১৯৬৫             ম্যামলক▪
অজেয় ভিয়েতনাম ১৯৬৬               ফিৎস▪
তীর                         ১৯৬৭              ভীরসা▪
মানুষের অধিকার     ১৯৬৮        লিবফিৎস▪
যুদ্ধং দেহি                  ১৯৬৮           যোদ্ধা ▪
লেনিনের ডাক           ১৯৬৯     আফানসি▪
▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪
পি এল টি প্রযোজনা উৎপল দত্তের অভিনীত ও নির্দেশিত নাটক -

রাইফেল                  ১৯৬৯        সৈনিক ▪
শোন রে মালিক      ১৯৬৯          মজুতদার▪
ঠিকানা                   ১৯৭১          
টিনের তলোয়ার     ১৯৭১           বেনীমাধব▪
সূর্যশিকার              ১৯৭১         সমুদ্র গুপ্ত ▪
ব্যারিকেড               ১৯৭২            ব্রুনো▪
টোটা                       ১৯৭৩         শাহজাফর▪
বুড়ো সালিকের
ঘাড়ে রোঁ                    ১৯৭৩    ভক্তপ্রসাদ ▪
দুঃস্বপ্নের নগরী          ১৯৭৪          লক্ষণ▪
লেনিন কোথায়          ১৯৭৬          স্ট্যালিন▪
এবার রাজার পালা      ১৯৭৭    মাড়োয়ারি▪
তিতুমীর                      ১৯৭৮      পাইরন▪
স্ট্যালিন '৩৪              ১৯৭৯         স্ট্যালিন▪
দাঁড়াও পথিক বর       ১৯৮০         মধুসূদন ▪
পান্ডবের অজ্ঞাতবাস  ১৯৮২       কীচক▪
মালোপাড়ার মা           ১৯৮৩     মহাজন▪
শৃঙ্খল ছাড়া                ১৯৮৩        শ্রমিক▪
আজকের শাজাহান     ১৯৮৪  কুঞ্জবিহারী▪
কল্লোল                      ১৯৮৬     ▪▪▪
অগ্নিশয্যা                    ১৯৮৮     বেন্টিঙ্ক▪
নীচে মহল                    ১৯৮৮     গগন▪
দৈনিক বাজার পত্রিকা  ১৯৮৮  গোপীবল্লভ▪
নীল সাদা লাল            ১৯৮৯         দাঁতো▪
একলা চলো রে           ১৯৮৯         অনাথ
 এছাড়া আরও বহু পথ নাটক , পোস্টার নাটক তিনি রচনা করেন -
পার্শপোট                           ১৯৫৯
স্পেশাল ট্রেন                    ১৯৬১
সমাজতান্ত্রিক চাল             ১৯৬৫
জনতার কল্লোল              ১৯৬৫
মৃত্যুর অতীত                   ১৯৬৬
দিনবদলে পালা              ১৯৬৭
ময়না তদন্ত                     ১৯৬৮
▪▪▪☆▪▪▪▪☆▪▪▪▪☆▪▪▪▪☆▪▪▪▪
বর্গী এল দেশে                   ১৯৭০
দিন বদলের পালা              ১৯৭৭
কালো হাত                        ১৯৭৯
পেট্রোল বোম                 ১৯৮২
কাঁচের ঘর                       ১৯৮৫
 মুমূর্ষু নগরী                      ১৯৮৭
হামে দেখনা হ্যায়               ১৯৮৯

তিনি কেবল অভিনেতা রা পরিচালক, নির্দেশনা করেন নি । সমাজ সংস্কৃতির তথ্যবহুল কিছু গ্রন্থ তিনি রচনা করেন যা নাট্য পিপাসু  গবেষকের কাছে অমূল্য সম্পদ । তা হল -  শেক্সপিয়রের সমাজচেতনা [ ১৯৭৩] ,  স্তানিস্লাভস্কি র পথ ( ১৯৭৫) , চায়ের ধোঁয়া  ( ১৯৭৯) , গিরিশ মানস [১৯৮৩]  ইত্যাদি ।

ছদ্মনাম - ভাস্কর গুপ্ত, মনোরঞ্জন মাইতি, রফিকুল ইসলাম, অর্জুন গুপ্ত ।

যে সূর্য পুব আকাশে ওঠে তা যেমন মাঝে আকাশের রোদের কারণ ঠিক তেমনই আবার অস্ত চলে যায় নদীর বহমান স্রোতের মতো । ঠিক তেমনই ১৯৯০ এ তিনি গভীর ভাবে অসুস্থ হন । দীর্ঘ রোগ ভোগের পর অবশেষে "উৎপলও যায় ঝরে দিনের শেষে জলের সাথে মিশে"  ১৯৯৩ তে ১৮  আগস্ট ৩-৩০মিনিটে মৃত্যুবরণ করেন । বাংলা থিয়েটারে এই সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব নিজস্ব প্রতিভা , দক্ষতা, পাণ্ডিত্যের জোরে আজ ও কেবল বাংলা বা ভারতীয় সাহিত্যে আলোচিত হন তা সতসত্য শ্লাঘার বিষয়।।

★বিশেষ ধন্যবাদ - M.R.Sir★

♦ অালোচক-- পায়েল ব্যানার্জী ♦
  (ছাত্রী-- বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়)
♦অ্যাডমিন -- সাকসেস বাংলা গ্রুপ♦

বিজনের প্রাঙ্গণে

♦বিজনের প্রাঙ্গণে ♦

 #ছেলেবেলা থেকেই এক নাট্য পরিমণ্ডলে তাঁর বেড়ে ওঠা।পরিবারে ছিল সাহিত্য, সঙ্গীত এবং নাট্যচর্চার আবহ। বাড়িতেই পরিবারের সবাই মিলে অভিনয় করতেন। হয়তো কোনোদিন শেক্সপিয়রের 'মার্চেন্ট অব ভেনিস 'এর কিছুটা অংশ হল। ছেলেটির বাবা করতেন শাইলকের চরিত্র, মা করতেন পোর্শিয়ার চরিত্র এবং আর তাঁরা নয় ভাইবোনের মধ্যে কেউ কেউ অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করতেন। এইভাবে ছেলেবলে থেকেই তাঁর মধ্যে তৈরী হয়েছিলো সাহিত্য এবং নাটকের প্রতি অনুরাগ। এই ছেলেটিই বিজন ভট্টাচার্য।

   #বিজন ভট্টাচার্যের নাম করলেই একটা নতুন যুগের সূচনার কথা আমাদের মনে আসে। সেটা হল  'নবান্ন'। ইতিহাস সৃষ্টি করা এই একটি নাটকের জন্যই তিনি নট্যমঞ্চ বা নাট্য সাহিত্যের ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করতে পারতেন। আমরা যাকে গণনাট্য বা নবনাট্য নামে অভিহিত করি, সেই ধারায় এক যুগান্তর সৃষ্টি করেছিল 'নবান্ন' নাটকটি।

   #বিজন ভট্টাচার্যের নাট্যচর্চার সূচনা হয়েছিল তাঁর বাবার কাছে, শেক্সপিয়রের মধ্য দিয়ে। কিন্তু তাঁর ভিতরে ভিতরে যেন একটা অদৃশ্য টানতৈররি হয়ে গিয়েছিল দেশজ শিল্পের প্রতি। গ্রামীণ জীবনের মানুষ লোকশিল্পের যেসব আঙ্গিকের মধ্যে তাদের বিনোদন খুঁজে পেত, সেসব আঙ্গিকের দিকেই তাঁর গভীর টান ছিল। গ্রাম্য যাত্রা, লোকনাট্য, আঞ্চলিক নাটক এসব তিনি অনেক দেখেছেন এবং তার মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে তাঁর মানসিক গঠন। তাই তাঁর কবিতা, উপন্যাস, নাটক এসবের মধ্যে ছাপ পড়েছে এবং একটা ভাঙাচোরা পরিবর্তনশীল যুগের মধ্যে দাঁড়িয়ে সেই সৃষ্টি মানুষের প্রাণের কাছে গ্ৰাহ্য হয়ে উঠেছিল।

   #১৯১৫ সালের ১৭ই জুলাই তিনি জন্মেছিলেন অধুনা বাংলাদেশের ফরিপুর জেলার খানখানাপুর গ্রামে। এ বিষয়ে মতান্তর আছে। বাবা ক্ষীরোদবিহারী ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক। মা সুবর্ণপ্রভা ছিলেন সংস্কৃতিমনা এক নারী। বাবার ছিল বালির চাকরি। কখনও ফরিদপুর, কখনও বসিরহাট, কখন ও মেদিনীপুর, আবার কখন ও সাতক্ষীরা বা আড়বেলে তিনি বদলি হতেন। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে ঘুরতেন ছোট্ট বিজন। বাবা যে স্কুলে পড়াতেন তিনিও সেই স্কুলে ভরতি হতেন। এর একটা অন্যতর দিক ছিল, যেটা তাঁকে অনেক বেশী  শিক্ষিত করে তুলেছিল। সেটা  হল বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ধরনের মানুষ তিনি দেখেছিলেন। দেখেছিলেন তাদের জীবন, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি।শিখেছিলেন তাদের ভাষা। গ্রামীণ লোকায়ত জীবনের মধ্যে এভাবে জড়িয়ে পড়তে পড়তেই তাঁর অবচেতন মনে তৈরি হয়ে যাচ্ছিল সৃষ্টিশীলতার এক বীজ। সেই সৃষ্টিশীলতার পিছনে ছিল শুধুই মানুষ। সমাজের নিচুতলার মানুষের দল। একেবারে কৈশোরে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূলস্রোতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। যোগ দিয়েছেন নানা আন্দোলনে ।কলকাতায় এসে আশুতোষ কলেজে পড়ার সময় সেখানে রবীন্দ্রনাথের নাটক অভিনয় করেছিলেন। তাঁর গান ও কবিতা শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম ও। একদিন তাঁর ডাকেই নেমে পড়লেন লবণ আইন ভঙ্গ আন্দোলনে। তারপর থেকেই শুরু হল তাঁর বিভিন্ন সাহিত্যিকদের সঙ্গে ওঠাবসা। শুরু করছিলেন 'অনামী চক্র' নামে এক আড্ডা। এই সময় থেকেই বিজন ভট্টাচার্য শুরু করেছিল কবিতা লেখা। লিখলেন, -
                   "শুরু হোক
                পৃথিবীর বুকে পলাশের রক্তে রাঙা
                    বসন্তের নতুন সংলাপ। "
তখনই বোঝা গিয়েছিল এক নতুন সংলাপের পথে তিনি তাঁর সৃষ্টিকে নিয়ে যেতে চান। লিখলেন বেশ কিছু ছোট গল্প এবং চার পাঁচটি উপন্যাস। সেসব সাহিত্যের মূল বিষয় ছিল মধ্যবিত্তের সংকট, হতাশা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আঁচে দগ্ধ জীবন, কিংবা উচ্চবিত্তের লোলুপতা। প্রশংসা আসছিল, তবু যেন তৃপ্তি পাচ্ছিলেন না। শুধু মনে হচ্ছিল হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনওখানে।

   #তখনই তাঁর মনে হয়েছে নাটক ই হল তাঁর সেই মাধ্যম, যেখানে তিনি মনের ভাবে ছড়িয়ে দিয়ে একটা আন্দোলনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেন। সময়ের পরিপেক্ষিত তাঁর মধ্যে তৈরী করে দিল এক দ্বায়বদ্ধতা। অসহায় দরিদ্র মানুষের কাছে 'রিলিফ' পৌঁছে দেওয়া দরকার। 'ফ্যাসিবিরোধী লেখক শিল্পী সংঘ' গঠন করে একটি নাটক অভিনয় করালেন। সেজন্য  নিজেই লিখে ফেললেন নাটক 'জবানবন্দী '।নিম্ন চাষিদের যন্ত্রনার কথা উঠে এল সে নাটকে। 'নবান্ন' যদি মহীরুহ হয়,  'জবানবন্দী ' তবে চারাগাছ।

   #গঙ্গাপদ বসুর লেখা থেকে 'নবান্ন' রচনার পরিপ্রেক্ষিতটি জানা যায়। দুজনেই তখন একটা সংবাদ পত্রে পাশাপাশি বসে কাজ করতেন। সংবাদ পত্রে চাকরির পাশাপাশি মনে হত, আরও কিছু কাজ করা দরকার। সময়কে ঠিক  মতো  ধরতে পারছে না সংবাদপত্র। তখন কলকাতা জুড়ে 'ফ্যান দাও 'কান্না। রাস্তায় অনাহারে মৃত মানুষের দেহ পড়ে আছে। জাপানি বোমার আতঙ্ক, কালোবাজারিরা সেই সুযোগে মুনাফা লুটছে,  সে এক বিষমকাল। ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞাণয় সংবাদ পত্রে তার কোনও চিহ্নই ফুটে উঠছে না। নিয়ম ভেঙে স্টেটসম্যান কাগজে প্রথম দুর্ভিক্ষের খবর ছাপানো হল। গঙ্গাপদ বসু একদিন দেশে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে যখন তিনি কাজে যোগ  দিলেন, বিজন তাঁকে দেশের কৃষকদের হাল জিজ্ঞাসা করলেন। চাষীদের সংকটের কথা শুনলেন।  তখনই বিজনের মনে ঝিলিক দিয়ে গেল নবান্ন'। নয়-দশ দিনের মধ্যে লিখে ফেললেন নাটকটা। গণনাট্য সংঘের প্রযোজনায় শ্রীরঙ্গমে মঞ্চস্থ হয় ১৯৪৪ সালে ২৪ অক্টোবর। সে নাটক অভিনয়ের পর অভিনয়ে ভেসে গেল ।পৌঁছে গেল শ্রমিকদের কাছে, চাষিদের কাছে। তৎকালীন বোম্বাইয়ে যখন সে নাটক কারখানায় শ্রমিকদের সামনে অভিনীত হল, তখন ভাষার প্রাচীর ভেঙে সে নাটক পৌঁছে গেল তাদের হৃদয় পুরে ।শম্ভু মিত্র এ নাটককে 'এপিক ড্রামা' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

   #তবে এই যে গণনাটে্যর উন্মেষ তা বেশিদিন স্থায়ী হল না। পারস্পরিক মতাদর্শগত কারণে তা ভেঙে গেল এবং শুরু হল নবনাট্যএর কাল।বাস্তবতা না শিল্প,  কোনটা প্রধান, এই তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে প্রাথমিক মতান্তর। ফলে নতুন নতুন নাট্য সংগঠন তৈরি হতে লাগল। ১৯৪৮ সালে শম্ভু মিত্রা তৈরি করলেন 'বহুরূপী ',১৯৫০ সালে উৎপল দত্ত তৈরি করলেন 'লিটিল থিয়েটার গ্রুপ ' এবং১৯৫১ সালে বিজন ভট্টাচার্য প্রতিষ্ঠা করলেন 'ক্যালকাটা থিয়েটার। অসংখ্য একাঙ্ক নাটকের পাশাপাশি  লিখেছেন 'জতুগৃহ ','গোত্রান্তর',  ছায়াপথ',  দেবীগর্জন',  'গর্ভবতী জননী'।

   #এর ফাঁকে ১৯৪৬ সালে। বিয়ে করলেন কবি মনীশ ঘটকের মেয়ে মহাশ্বেতা দেবীকে। তারপরেই বোম্বাই চলে গেলেন। রুটির সন্ধানে বোম্বাইয়ে চিত্রনাট্য লেখার কাজ শুরু করলেন।  তাঁর লেখা গীতিনাট্য 'জিয়নকন্যা' নিয়ে বলিউডে তৈরি হয় ফিল্ম 'নাগিন'। কিন্তু কলকাতার নাটক ছেড়ে প্রবাসে মন বসল না।  ফিরে এলেন কলকাতায়। আবার শুরু হল নাটক আর অভিনয়।  

    #বেশ কিছু চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন। মেঘে ঢাকা তারা',  'বাড়ি থেকে পালিয়ে ',সুবর্ণরেখা ইত্যাদি।  পাশাপাশি নাটক লেখা আর অভিনয়। একটা সময় ছেড়ে দিলেন 'ক্যালকাটা' থিয়েটার। ১৯৭৹ সালে তৈরি করলেন নতুন দল, 'কবচকুণ্ডল'। একে একে অভিনয় করলেন 'আজ বসন্ত',  'মরাচাঁদ', 'লাশ ঘুইরা যাউক', 'চলো সাগরে '।১৯৭৮ সালের ১৯ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়।  আগের দিন রাতেও তিনি 'মরাচাঁদ' নাটকে পবনের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। সেই নাটকের সংলাপই যেন  ছিল তাঁর জীবন মন্ত্র---
            "বাঁচবো রে আমরা বাঁচবো "।


♦অালোচক -- সুসমিতা বেরা ♦
♦মডারেটর সাকসেস বাংলা♦